বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান, খুলনা
এস এম শাহরিয়ার
অশান্ত খুলনার রুপসা উপজেলা, ঘটছে একের পর এক হত্যাকান্ড
খুলনার রূপসা উপজেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, অর্থ ভাগাভাগি এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে জয় ঢালী নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরাধী চক্রগুলোর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া রাতে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকেরা।
গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১টার দিকে আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে জয় ঢালী (২৭) নামে এক যুবকের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গলা কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
দুর্জনীমহল গ্রামের বাসিন্দা রবি বলেন, “জয়কে ছোটবেলা থেকে আমাদের চোখের সামনে বড় হতে দেখেছি। প্রকাশ্যে এভাবে একজনকে হত্যা করা হবে, তা কখনো ভাবিনি। এখন ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগে।”
এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৫ আগস্ট রাত ১টার দিকে বৈহাটি ইউনিয়নের একটি ইটভাটায় ঢুকে ফজল শেখ (৩৫) নামে এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, চুরি, মাদক ব্যবসা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এর আগে নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে ঈদের কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফেরার পথে গুলিতে নিহত হন রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ (৫২)। ঘটনাটি নিয়েও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
গত জুলাইয়ে জাবুসা চৌরাস্তা এলাকায় ভ্যান চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলার শিকার হন এক ব্যক্তি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। একই সময়ে ডাকাতি ও অন্যান্য মামলার আসামি রাজু হাওলাদার (৩৮) প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়ার সময় রূপসার কুদির বটতলা এলাকায় আবারও গুলি চালানো হয় বলে জানা গেছে।
গত বছরের ৬ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে পূর্ব রূপসার নৈহাটি ইউনিয়নের প্রহিষনগর গ্রামের বাদুর মাঠের পাশে প্রবাসী সোহেল হাওলাদার (৪৫)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পুলিশ তখন জানিয়েছিল, মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
এর আগে মোছাকারপুর এলাকায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে সন্ত্রাসীদের গুলিতে রনি প্রামাণিক ওরফে কালা রনি (৩০) নিহত হন।
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রূপসা সেতুর পূর্বপাড়ে জাবুসা অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্রীনবাংলা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা সাগর শেখ (৩০)কে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করা হয়। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১টার দিকে বাগমারা এলাকার একটেল টাওয়ারের পাশে জয়পুর গ্রামের মাস্টারবাড়ির সামনে মো. ইমরান হোসেন মানিক (৩২)কে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় অস্ত্রধারীরা। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
গত ২৬ জুন রাত ৮টার দিকে রাজাপুর গ্রামের পপুলার এলাকায় সোহাগের বাড়িতে গোলাগুলির ঘটনায় সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর গ্রুপের সদস্য সাব্বির (২৭) নিহত হন। সাদ্দাম হোসেন (২৮) নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা ও গ্রেনেডসদৃশ বস্তু উদ্ধারের কথাও জানা যায়।
এ ছাড়া পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বাগমারা গ্রামের চা দোকানি হৃদয় শেখকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, রূপসায় হত্যাকাণ্ড এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ, গুলি কিংবা হত্যার ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে।
নৈহাটি বাজারের মুদি দোকানি রায়হানুল ইসলাম বলেন, “প্রতি মাসেই কোনো না কোনো খুনের খবর শুনতে হয়। পুলিশ আসে, কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়, পরে আবার অনেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
আইচগাতী ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য, মাদক ব্যবসা এবং অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করেই অনেক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হচ্ছে। তাঁর দাবি, তরুণদের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রও ব্যবহার করছে।
জাবুসা গ্রামের গৃহবধূ মালেকা বানু বলেন, “রাত ১০টার পর স্বামী বাড়ি ফিরলে দরজা খুলতেও ভয় লাগে। আমরা কোনো রাজনীতি বুঝি না, কারও সঙ্গে বিরোধও নেই। শুধু নিরাপদে বাঁচতে চাই।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দুই বছরে রূপসা উপজেলায় ২৫টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাঁদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধী চক্রকে স্থায়ীভাবে দমনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রূপসায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক মীর বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আলাদা সামাজিক বা অপরাধমূলক কারণ রয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পলাতক আসামিদের ধরতে র্যাব ও যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু ঘটনার পর অভিযান চালানো নয়, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ, অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে রূপসায় আবারও স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরে আসবে।
