কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি
মোঃ ইব্রাহিম খলিল
অদম্য মেধাবীদের গল্প: দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জিপিএ-৫, উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কায় কাউনিয়ার পাঁচ মেধাবী
গরিব ঘরে জন্ম তাদের। অভাব-অনটন যেন নিত্যসঙ্গী। একবেলা খাবার জুটলে পরের বেলার চিন্তা করতে হয়। তবুও দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে জীবনযুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারা। প্রতিকূলতার মাঝেও মেধার আলো ছড়িয়ে তারা যেন গোবরের মধ্যে ফুটে থাকা পদ্মফুল।
কারও বাবা ট্রাকচালক, কেউ দরিদ্র কৃষকের সন্তান, আবার কারও বাবা দিনমজুর কিংবা হোটেলের কর্মচারী। অভাবের সংসারে থেকেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে কাউনিয়ার পাঁচ অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু ভালো ফলাফলের পরও তাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাবে কে?
অর্থাভাবে ভালো কলেজে ভর্তি ও পরবর্তী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষরা এগিয়ে এলে এসব মেধাবীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
ফাতিন হাসনাত পরশ
দরিদ্র ঘরে জন্ম ফাতিন হাসনাত পরশের। নতুন বই কিনে পড়ার সামর্থ্য ছিল না তার। নানা প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
পরশ উপজেলার শাহাবাজ থানাপাড়া গ্রামের গার্মেন্টসকর্মী মো. আজাদুল ইসলাম ও গৃহিণী মোছা. পারুল বেগমের ছেলে। দুই শতক বাড়ির ভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো জমিজমা নেই। নিজেদের ঘরও নেই; মা-বোনসহ ফুফুর বাড়িতে বসবাস করে তারা।
এক ভাই ও এক বোনসহ চার সদস্যের সংসার তাদের। গার্মেন্টসকর্মী বাবার সামান্য আয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পরশ নিজেই প্রাইভেট পড়িয়েছে।
পরশের মা পারুল বেগম বলেন, ছেলের অনেক স্বপ্ন। লেখাপড়া করে সে সেনাবাহিনীর বড় কর্মকর্তা হতে চায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে হবে, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। আর্থিক সহযোগিতা না পেলে মেধাবী পরশের শিক্ষাজীবনের প্রদীপও নিভে যেতে পারে বলে আশঙ্কা পরিবারের।
ইফফাত আরা ইথিন
কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মোছা. ইফফাত আরা ইথিন। উপজেলার ভূতছাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক ইদ্রিস আলী ও গৃহিণী মোছা. আরজু খাতুনের মেয়ে সে।
চরম অর্থসংকটের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে এবার এসএসসিতে সাফল্য পেয়েছে ইথিন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারুকাজ করা টুপি সেলাই এবং প্রাইভেট পড়ানোর অর্থ দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে সে।
এক ভাই ও এক বোনসহ চার সদস্যের পরিবার তাদের। বাড়ির ভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো জমিজমা নেই। এসএসসিতে ভালো ফল করলেও উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় ইথিন ও তার পরিবার।
ইথিনের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু দরিদ্র কৃষক বাবার পক্ষে মেয়ের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন। মেয়ের সাফল্যে মা আরজু খাতুন আনন্দিত হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। মেয়ের স্বপ্ন পূরণে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
আবির হাসান
দারিদ্র্য ও অর্থসংকটও দমিয়ে রাখতে পারেনি আবির হাসানকে। উপজেলার তালুক শাহাবাজ আটনী গ্রামের হোটেলের রুমবয় আতাউর রহমান ও গৃহিণী মনোয়ারা বেগমের ছেলে আবির। চরম অর্থসংকটের মধ্যেও কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
তবে সাফল্যের পরও উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আবির। মা মনোয়ারা বেগম জানান, তাদের ৮ শতক বাড়ির ভিটা ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। এক ভাই ও দুই বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে সংসারে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েন লেগেই থাকে।
অভাবের সব প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে আবির ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণের মতো আর্থিক সামর্থ্য দরিদ্র বাবা-মায়ের নেই। তাই ছেলের উচ্চশিক্ষার জন্য সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা ও আশীর্বাদ কামনা করেছেন তার মা।
রাসেল মিয়া
দৃঢ় মনোবল, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে জয় করেছে রাসেল মিয়া। কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
রাসেল উপজেলার তালুক শাহাবাজ গ্রামের দিনমজুর আব্দুল হাকিমের ছেলে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবার সঙ্গে খেত-খামারে দিনমজুরের কাজও করেছে সে। মাত্র চার শতক বাড়ির ভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো জমিজমা নেই।
দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হয় দিনমজুর বাবাকে। তারপরও অভাবকে জয় করে রাসেল এগিয়ে যেতে চায়। তার স্বপ্ন বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হওয়া।
রাসেলের মা শেফালী বেগম বলেন, ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তাদের নেই। ছেলের স্বপ্ন পূরণে সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
থমকে আছে স্বপ্ন
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাফল্যে পরিবারগুলো যেমন আনন্দিত, তেমনি উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তারও শেষ নেই। দারিদ্র্য তাদের মেধাকে থামাতে পারেনি, কিন্তু উচ্চশিক্ষার ব্যয় এখন তাদের স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষা সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে এসব অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে পারে। আর্থিক সহযোগিতা পেলে দারিদ্র্যের অন্ধকার পেরিয়ে তারা একদিন নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করে পরিবার ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাদের পরিবারের।
