খুলনায় বাড়ছে খুন-সহিংসতা, ৮ মাসে ২২ হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ


বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান,খুলনা

এস এম শাহরিয়ার

খুলনায় বাড়ছে খুন-সহিংসতা, ৮ মাসে ২২ হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ

খুলনা মহানগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে খুন, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত নগরীতে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশ মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অপরাধের এমন প্রবণতায় সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ অভিযান চালালেও অপরাধ দমনে নাগরিক সমাজের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, নগরীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশের সঙ্গে মাদকের কোনো না কোনো যোগসূত্র রয়েছে। বাকি হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তারসহ অন্যান্য কারণে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাও সহিংসতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এসব দ্বন্দ্বের জেরে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বলে তাদের দাবি।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্যের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি হয়েছে। আগের মতো উদ্যম নিয়ে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না, সমাজের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সম্প্রতি চরমপন্থিদের তৎপরতা বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

অন্যদিকে খুলনা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) এমএম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যক্রম থেমে নেই। নিয়মিত অভিযানে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার এবং বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং মাদককে কেন্দ্র করে নগরীতে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নাগরিক সমাজের কাছ থেকে তথ্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। এ জন্য বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠকসহ জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

একই এলাকায় কয়েক ঘণ্টায় দুই খুনঃ

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে নগরীর লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকার দুটি হত্যাকাণ্ডের কথা উঠে এসেছে। একই রাতে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার দিকে আশিবিঘা কালভার্টসংলগ্ন এলাকায় মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবককে গুলি ও ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মঞ্জুরুল আশিবিঘা এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় সেন্টারিং ও স্যানিটারি মিস্ত্রি ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল বলে তারা জানতেন না।

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোশাররফ হোসেন জানান, একটি মাঠে ফুটবল খেলা চলাকালে কয়েকজন যুবক মঞ্জুরুলকে খুঁজছিল। পরে তাকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করা হয়। হত্যার কারণ অনুসন্ধান চলছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর একই এলাকার একটি গলিতে নাজমুল (১৮) নামে আরেক যুবকের মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। তিনি মনির শেখের ছেলে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, নাজমুলকে কীভাবে এবং কারা হত্যা করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

আগস্টেই পাঁচ হত্যাকাণ্ডঃ

চলতি আগস্ট মাসেও খুলনা নগরী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১১ আগস্ট রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের কিসমত খুলনা এলাকায় একটি ইটভাটায় ফখরুল শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এর চার দিন পর ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের একটি এলাকায় জয় ঢালি (২৫) নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় একটি অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা পুলিশ জানিয়েছিল।

১৮ আগস্ট নগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়ের মহল এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে রাজু শিকদার বিশ্বাস (২৫) নামে এক যুবককে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।

এরপর আশিবিঘা এলাকায় একই রাতে দুই যুবকের হত্যাকাণ্ড ঘটে। ফলে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই খুলনা অঞ্চলেই অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে।

হামলা-সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছেঃ

শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও ছুরিকাঘাতের ঘটনাও ঘটছে। পুরাতন রেলস্টেশন এলাকার রেলওয়ে মসজিদের পেছনে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় পরে তার মৃত্যু হয়। একই দিনে আযমখান কমার্স কলেজ এলাকায় এক যুবক ধারালো অস্ত্রের হামলায় আহত হন। বয়রা এলাকার একটি স্থানে প্রতিপক্ষের হামলায় আরও একজন আহত হন।

এর আগে মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। নিরালা মোড়েও এক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি করা হলেও তিনি অক্ষত থাকেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর নগরীর কিছু এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষও এর প্রভাবের মধ্যে পড়ছেন।

নগরীর বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রায়ই বিভিন্ন এলাকায় মারামারি, হামলা কিংবা গুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকে এসব ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মনে করেন।

নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে অপরাধের একটি বড় উৎস বন্ধ করা সম্ভব হবে।

খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

### পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর দাবিঃ

খুলনা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ দমনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান ও চেকপোস্ট কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

কেএমপির কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, কিছু ঘটনা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যায়। তারপরও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে সাধারণ মানুষকেও পুলিশের সঙ্গে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরাধ দমনে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বিভিন্ন এলাকায় সুধী সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ও তথ্য সরাসরি শোনা হচ্ছে।

তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল বাড়ানো হবে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরবে বলে মনে করছেন তারা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন