চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনাকবলিত পরিত্যক্ত জাহাজটিতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ছিল। দুর্ঘটনার সময় বিষাক্ত এই গ্যাসের মাত্রা ছিল ১০০ পিপিএম। মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই গ্যাসের প্রভাবেই ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
এছাড়া গতকাল শনিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে পরিদর্শন করা প্রতিনিধিদলও জাহাজটিতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন রয়েছে বলে নিশ্চিত করে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দুদিনে মামলা দায়ের হয়নি। পুলিশ বলছে, হতাহত পরিবারের সদস্যদের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
এদিকে, এ ঘটনায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পে পুরোনো জাহাজগুলোর আবদ্ধ জায়গায় অক্সিজেন থাকে না বলে হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপন্ন হয়। তবে এসব বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করেই জাহাজ কাটতে হয়। কিন্তু ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ওই জাহাজ থেকে ক্ষতিকর গ্যাস অপসারণ না করে শ্রমিকদের কাটতে পাঠানোয় এ প্রাণহানি ঘটেছে। তারা জানিয়েছেন, ০.০১-১০ পিপিএম হাইড্রোজেন সালফাইড থাকলে চোখ জ্বালাপোড়া করে, শ্বাসকষ্ট হয়। আর ১০০ পিপিএম থাকলে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথা হয়ে যেকেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি ফুসফুসকে আক্রান্ত করে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হতে পারে, যা ঘটেছে ওই ৯ শ্রমিকের ভাগ্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিপইয়ার্ডগুলোকে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্রিন সনদ দিচ্ছে, তাদের যথাযথ তদারকিও থাকতে হবে। কারণ যেসব মানদণ্ড দেখে সনদ দেওয়া হয়েছে, পরে সেগুলোর চর্চা করা হচ্ছে কি না এবং নিরাপত্তার দিকগুলো নিয়মিত রয়েছে কি না, তাও তদারকি করা প্রয়োজন। এছাড়া সরকারি দপ্তরগুলোও দায় এড়াতে পারে না।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড থাকলে যেকোনো সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক নিশ্বাস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এটি বেশি পরিমাণে থাকলে অনেকে মারা যান। তিনি আরো বলেন, কোনো কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপন্ন হয়। হয়তো জাহাজের এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে গ্যাসগুলো আটকে ছিল। ওই জায়গা কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। মুখে বিশেষায়িত মাস্ক থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো কম হতো বলে তিনি জানান।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন জানান, আমরা কমপক্ষে চার ঘণ্টা পর সেখানে পরিদর্শনে গেলেও ১০.৮ পিপিএম মাত্রায় হাইড্রোজেনের উপস্থিতি পেয়েছি। এতে ধারণা করা যায়, যখন ঘটনা ঘটেছিল তখন এটি অন্তত ১০০ পিপিএম মাত্রার উপরে ছিল।
এদিকে, দুর্ঘটনার পর সীতাকুণ্ডের গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিন হওয়ার পরও দুর্ঘটনা থামছে না। গত ১৩ বছরে ১৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরে দুটি গ্রিন শিপইয়ার্ডে আলাদা দুটি দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জানা গেছে, ইয়ার্ডগুলো গ্রিন হতে শুরু করলে দূর্ঘটনা কমে আসে। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসএন করপোরেশন গ্রিন শিপইয়ার্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ছয়জনের মৃত্যু হয়। সবশেষ গত শুক্রবার ফেরদৌস স্টিলে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হলো। এতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, গ্রিন ইয়ার্ড হলেও মালিকপক্ষের গাফিলতি ও তড়িঘড়ি করে জাহাজ কাটার প্রবণতায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিরাপত্তার বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ মালিকদের হাতে থাকায় খামখেয়ালিপনায় ইয়ার্ড চালাচ্ছেন তারা।
জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিকদের সংগঠন বিএসবিআরএ সূত্র জানায়, হংকং কনভেনশন অনুসারে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প ২০২৫ সাল থেকে শতভাগ গ্রিন ইয়ার্ড হয়েছে। নন-গ্রিন কয়েকটি ইয়ার্ড এখনো থাকলেও আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ওই ইয়ার্ডগুলো জাহাজ আনতে পারছে না। অভিযোগ রয়েছে, শুধু ফ্লোর পাকা করে আর কয়েকটি আধুনিক ক্রেন এনেই নামকাওয়াস্তে একটি কোম্পানি থেকে গ্রিন ইয়ার্ডের সার্টিফিকেট নিয়ে আইনের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছেন তারা। কিন্তু প্রকৃত গ্রিন ইয়ার্ডের নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না ।
শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কাজ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, জাপানের ক্লাস এনকে, ফ্রান্সের ব্যুরো ভেরিটাস ও ভারতের আইআরএস নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন স্বৃীকৃতি দিচ্ছে। এর মধ্যে জাপানের ক্লাস এনকে মানকে সর্বোচ্চ ধরা হয়। তবে সীতাকুণ্ডে ২৩টি শিপইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ড হলেও মাত্র পাঁচটির এই ক্লাস এনকে সনদ রয়েছে। বাকি ১৮টিই ভারতের আইআরএস থেকে সনদ নিয়ে নামকাওয়াস্তে গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে অপারেশন চালাচ্ছে।
তিনি জানান, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি সেফটি সিকিউরিটির বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। শ্রমিকদের পিপিই ছাড়া জাহাজে পাঠানোর সুযোগ গ্রিন ইয়ার্ডের নীতিমালায় না থাকলেও ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে তার কিছুই মানা হয়নি। আমরা নিহত শ্রমিকদের পরনে ইউনিফর্ম ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। অথচ মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, গামবুট ছাড়া জাহাজে ওঠার সুযোগই নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর ফজলুল করিম মিন্টু বলেন, যেসব শিপইয়ার্ড গ্রিন হয়েছে তাদের যেমন কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে, তেমনি নতুনভাবে গ্রিন হতে যাওয়া ইয়ার্ডগুলোকে তদারকি করতে হবে। সরকারি অফিসগুলো, বিশেষ করে বিস্ফোরক অধিদপ্তর এর দায় এড়াতে পারে না বলে জানান তিনি। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইক্রো থিংক ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, গত দুই দশকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত ৪০০ জনের বেশি শ্রমিক মারা গেছেন এবং ছয় হাজারের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকদের গড় আয়ু জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ২০ বছর কম। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২০ সাল থেকে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ৫২০টির বেশি জাহাজ ভাঙার কাজ করেছেন।
এদিকে ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও বিএসবিআরএ আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গতকাল দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ড পরিদর্শনে এসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তদন্তে কারো গাফিলতি, দায়িত্বে অবহেলা বা নিরাপত্তায় ত্রুটি পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুক্রবার ছুটির দিন শ্রমিকরা কেন কাজ করছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ নিহতদের পরবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। পরিবারের সদস্যরা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে ইয়ার্ড মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করবে।
