বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান, খুলনা
এস এম শাহরিয়ার
দুদকের মামলার আসামি, তবুও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এস এম মুরাদ
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো করোনা পরীক্ষার ফি আত্মসাতের মামলা। ওই মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দাখিল করা অভিযোগপত্রে তার নাম আসামি হিসেবে রয়েছে। এরপরও তিনি খুলনা জেনারেল হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, রিকুইজিশন তৈরি, রোগীদের খাবারের বিল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও লিনেন সরবরাহের বিল, ইউজার ফি এবং বিভিন্ন ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এই বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও দায় নির্ধারণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের বিষয়।
রোগীদের খাবার নিয়েও প্রশ্ন:
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিনের ডায়েট তালিকায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী খাবার বরাদ্দ দেখানো হলেও কোনো রোগী দিনের মাঝামাঝি সময়ে ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেলে তার বরাদ্দকৃত খাবারের হিসাব নিয়ে স্বচ্ছতা থাকে না।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অব্যবহৃত খাবারের সংখ্যা ও পরবর্তী সময়ে নতুন রোগীর বিপরীতে তা সমন্বয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহকৃত খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অনেক রোগী হাসপাতালের খাবার পছন্দ না হওয়ায় বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, খাবার সরবরাহে মাঝে-মধ্যে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কোনো রোগী ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেলে তার বরাদ্দকৃত খাবার পরবর্তী সময়ে ভর্তি হওয়া রোগীকে দেওয়া হয়।
করোনা পরীক্ষার ফি আত্মসাতের মামলায় আসামি:
ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিভুক্ত অভিযোগটি করোনা পরীক্ষার ফি সংক্রান্ত। দুদকের তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে তাকে মামলার আসামি করা হয়। একই মামলায় খুলনার তৎকালীন ও সাবেক সিভিল সার্জনসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছিল।
দুদকের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা জেনারেল হাসপাতালে বিদেশগামী যাত্রী ও সাধারণ কোভিড-১৯ রোগীদের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য মোট ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ১০০ টাকা ফি আদায় করা হয়। এর মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা। অবশিষ্ট ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
দুদকের মামলায় অভিযোগ করা হয়, ল্যাবে পাঠানো নমুনার প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম রোগী দেখিয়ে ইউজার ফি জমা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে সরকারি রসিদ বইয়ের বাইরে ডুপ্লিকেট রসিদ ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে।
দুদকের তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের দায়িত্বকালীন সময়ে ১ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা আত্মসাতের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়।
নিজেরাই তদন্ত কমিটি, পরে দুদকের তদন্তে ভিন্ন তথ্য:
মামলাটি নিয়ে প্রকাশিত দুদকের তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা পরীক্ষার ফি নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পর তৎকালীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তী দুদক তদন্তে বিষয়টি আরও বিস্তৃত আকারে সামনে আসে এবং একাধিক ব্যক্তিকে মামলায় আসামি করা হয়।
২০২৩ সালে দুদকের চার্জশিট দাখিলের পর করোনা পরীক্ষার ফি আত্মসাতের ঘটনায় তৎকালীন খুলনা সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদকে ওএসডি করা হয়েছিল। একই মামলায় ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের নামও চার্জশিটে ছিল।
মামলার বিষয়টি স্বীকার, দায়িত্ব পালনে বাধা দেখছেন না মুরাদ:
দুদকের মামলার বিষয়ে ডা. এস এম মুরাদ হোসেন বলেন, মামলাটি আদালতে চলমান রয়েছে। তার ভাষ্য, কোনো মামলা চলমান থাকলেই একজন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, এমনটি তিনি জানেন না।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে দুদকের মামলায় আসামি একজন কর্মকর্তা হাসপাতালের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলে সেখানে পর্যাপ্ত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা।
