কলকাতার রাস্তায় দেখা গেল ত্রিশূল হাতে গেরুয়াধারীদের এক আতঙ্কের মিছিল। শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলের লক্ষ্য বেকবাগানে অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন ঘেরাও। প্রকাশ্যে রাজপথে সন্ন্যাসীদের এই ধরনের আগ্রাসী আচরণ স্পষ্টতই গেরুয়াধারীদের চরম সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের শামিল, যা প্রতিবেশী দুই দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করার এক গভীর চক্রান্ত—এমন মন্তব্য করেছেন অনেকে।
শনিবার ‘বিবেকানন্দ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান’ ও ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-এর ব্যানারে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় ২০০ সাধু-সন্ত ও সন্ন্যাসিনী এই মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি বেকবাগানের কাছাকাছি পৌঁছাতেই জনা পঞ্চাশেক পুলিশ উপ-হাইকমিশন থেকে ৩০০ মিটার দূরে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেন। এরপরই ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টায় পুলিশের সঙ্গে রীতিমতো সংঘর্ষে জড়ান গেরুয়া বসনধারী এই বিক্ষোভকারীরা। শেষ পর্যন্ত তারা রাস্তা আটকে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন। এই বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল বাংলাদেশে কারাবন্দি ‘বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ’-এর মুখপাত্র ও হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তি দাবি। বেশ কিছুক্ষণ স্লোগান ও অশান্তির পর পাঁচ জনের একটি প্রতিনিধিদল উপ-হাইকমিশনে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেয়। এই দলে ছিলেন— এনসিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক উত্তীয় কুণ্ডু, জাতীয় কমিটির সদস্য দিব্যেন্দু দাস, বিবেকানন্দ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এনসিপিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রসাদ মহারাজ, প্রভাস চৌধুরী এবং জয়দেবানন্দজী।
স্মারকলিপিতে বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু নাগরিকদের জীবন, সম্পদ, ব্যবসা ও বসতবাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের শারীরিক আক্রমণ, হত্যা, নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি, সমগ্র বাংলাদেশের হিন্দু মন্দির, আশ্রম ও পূজামণ্ডপের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া, হামলা বা ভাঙচুরের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করা, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের দ্রুত বিচার এবং সংখ্যালঘুরা যাতে ভয়ভীতি ছাড়া ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ বজায় রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে দেশদ্রোহিতার মামলায় বন্দি রয়েছেন চিন্ময় প্রভু। বিক্ষোভকারীদের দাবি, দিনের পর দিন তার জামিন খারিজ হয়েছে। অতীতে মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে এই বিচারকে প্রহসন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছিল এবং বর্তমানে সরকার বদলে গণতান্ত্রিক তারেক রহমানের সরকার এলেও বিচারে কোনো গতি আসেনি। সম্প্রতি তার মায়ের অসুস্থতার কারণে প্যারোলের আবেদন খারিজ হওয়া এবং পরবর্তীতে মায়ের মৃত্যুতে মাত্র ৫ ঘণ্টার জন্য মুক্তির বিষয়টিকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ঔদাসীন্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করা হয়।
স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পর প্রসাদ মহারাজ দাবি করেন, এই পদক্ষেপ কোনো দেশ বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানবতা, বিশ্বশান্তি ও মৌলিক অধিকারের পক্ষে একটি আবেদন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
এনসিপিআই-এর রাজ্যস্তরের নেতা সুব্রত রায় অভিযোগ করেন, চিন্ময় প্রভু দীর্ঘদিন বিনা বিচারে বন্দি এবং তার মায়ের মৃত্যুতেও তাকে যেভাবে আটকানো হয়েছে তা বেদনাদায়ক। তিনি আরও জানান, পুলিশ তাদের স্মারকলিপি জমা দিতেও বাধা দিচ্ছিল। বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের পক্ষ থেকে এই পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের দাবিদাওয়া সংবলিত স্মারকলিপি গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহাওয়ার মাঝে কলকাতার বুকে গেরুয়াধারীদের এমন সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক মিছিল ও আচরণ গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
