কাউনিয়া উপজেলা প্রতিনিধি:
মোঃ ইব্রাহিম
দরজার সামনে বসে কাঠের গায়ে শেষ আঁচড় দিচ্ছিলেন এক কারিগর। পাশে পড়ে আছে তৈরি করা কয়েকটি ঢোল, খোলসহ নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। দোকানের তাকজুড়ে সাজানো বাদ্যযন্ত্র থাকলেও নেই ক্রেতাদের ভিড়। যে সময়ে দুর্গাপূজার মৌসুমে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকার কথা, সেই সময়েও নেমে এসেছে নীরবতা।
এ চিত্র রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের। একসময় পূজা, বিয়ে, পালাগান, যাত্রা কিংবা লোকসংগীতের আসর মানেই ছিল ঢাক-ঢোল ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক কদর। কিন্তু আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, ডিজিটাল মিউজিকের বিস্তার এবং গ্রামীণ সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ায় হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা দিন দিন কমছে। ফলে বংশপরম্পরায় এ পেশায় থাকা পরিবারগুলো পড়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
কাউনিয়ার রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়কের ‘শিবু তাল তরঙ্গ’ দোকানের কারিগর সুবাস চন্দ্র দাস প্রায় ২৫ বছর ধরে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজ করছেন। তার পরিবারও প্রায় ৩০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, দুর্গাপূজার মৌসুমে আগে ৩০ থেকে ৩৫টি বাদ্যযন্ত্র তৈরির অর্ডার পাওয়া গেলেও এবার এখন পর্যন্ত ১০টির কাজও পাননি।
সুবাস চন্দ্র দাস বলেন, “আগে সারা বছরই কমবেশি কাজ থাকত। এখন অনেক সময় বসে থাকতে হয়। পূজার সময়ও কাজ অনেক কমে গেছে।”
আরেক কারিগর শিবু চন্দ্র দাস জানান, এক যুগ আগেও বর্ষাকাল ছাড়া প্রায় সারা বছরই তাদের ব্যস্ত সময় কাটত। বর্তমানে মাঝে মধ্যে খোল তৈরি কিংবা পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামতের কাজ পাওয়া যায়। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে পেশাটিও।
শুধু কারিগরদের আয়ই কমেনি, কমেছে লোকসংগীতের নানা আয়োজনও। কণ্ঠশিল্পী সতীশ চন্দ্র বলেন, রংপুরের ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, বাউল, কবিগান ও পালাগানের আসর এখন আগের মতো চোখে পড়ে না। সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ায় হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিস্তা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আঃ ছালাম বলেন, গ্রামগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমে যাওয়ার কারণে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও কমেছে। ঐতিহ্যবাহী এসব বাদ্যযন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কাউনিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনছার আলী জানান, বর্তমানে উপজেলায় মাত্র দুটি দোকানে ৪ থেকে ৬ জন কারিগর বাদ্যযন্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এসব বাদ্যযন্ত্র একসময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, আধুনিকতার কারণে ঢাক-ঢোল, তবলা, একতারা ও দোতারার চাহিদা কমেছে। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।
কাউনিয়ার এসব কারিগরের কাছে বাদ্যযন্ত্র কেবল একটি পণ্য নয়; এটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবিকার অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্যের বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দুর্গাপূজার মণ্ডপে এখনও ঢাকের শব্দ শোনা যায়, কিন্তু সেই ঢাক তৈরির কারিগরদের জীবনে আগের মতো ব্যস্ততার শব্দ নেই।
