আর্জেন্টিনা জানাল তারা আসছে!


 কিছু খেলোয়াড় শুধু ম্যাচ জেতান আর কিছু খেলোয়াড় গোল করে ম্যাচ জেতান; সে সঙ্গে সাফল্য-কৃতিত্বের নতুন ইতিহাসও লেখেন। লিওনেল মেসি এখন দ্বিতীয় দলের ফুটবলার।’


বিশ্বকাপে প্রথম গোল করার ঠিক ২০ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচে আবারও ইতিহাস লিখলেন তিনি। কানসাস সিটির উজ্জ্বল রাতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে জিতিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে আর্জেন্টিনা জানিয়ে দিলÑচ্যাম্পিয়নদের এভাবেই শুরু করতে হয়! এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা বাড়তি ঘোষণা দিল যেন ট্রফিটা এখনো তাদের হাতেই মানায়!

ম্যাচটি ছিল মেসির জন্য মাইলফলকের পর মাইলফলক স্পর্শ করার রাত। বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক, বিশ্বকাপে মোট ১৬ গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে সমতা, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচ এবং ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামা—এক সন্ধ্যাতেই যেন নিজের কিংবদন্তিকে আরো সমৃদ্ধ করলেন ৩৮ বছর বয়সি ফুটবল বিস্ময় মেসি।


শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার দখলে। কোচ লিওনেল স্কালোনির ৪-৩-৩ ছক ছিল নিখুঁত। বল হারালেই পুরো দল নেমে আসছিল সংকুচিত রক্ষণে। এমনকি মেসি নিজেও শুরুতে যে কয়েকবার বল হারান, সেই দখল ফেরত পাওয়ার জন্য নিজেই ছোটেন। আর বল পেলে ছোট ছোট নিখুঁত পাসে আলজেরিয়ার ডিফেন্স ভেঙে মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছিলেন আক্রমণভাগে। পরিসংখ্যানে বলের দখল ছিল আলজেরিয়ার ৫২ শতাংশ; কিন্তু সেটি ছিল অনেকটাই অর্থহীন। তাদের আক্রমণ আর্জেন্টিনার রক্ষণকে কখনই প্রকৃত চাপে ফেলতে পারেনি।


ষষ্ঠ মিনিটেই জাদুর আভাস দিয়েছিলেন মেসি। বাম পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়ে যায়। হরিজেন্টাল আক্রমণের সুবিধা করতে না পেরে আর্জেন্টিনা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কৌশল বদলায়। ভার্টিক্যাল, অর্থাৎ সোজাসুজি জায়গা থেকে আক্রমণের ছক কষে মেসির দল। সে কৌশলে প্রথম সাফল্য এলো ম্যাচের ১৭ মিনিটে। রদ্রিগো দি পলের বাড়ানো বল বক্সের বাইরে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ-পায়ের অবিশ্বাস্য বাঁক খাওয়ানো শটে গোলরক্ষক লুকা জিদানেকে পরাস্ত করেন তিনি। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন একটাই ধ্বনি—‘মেসি... মেসি... মেসি...’, (১-০)।


প্রথমার্ধে একচেটিয়া আধিপত্যের পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছুটা ছন্দ হারায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা বড় মুহূর্তেই নিজেদের পরিচয় দেন। ৬৪ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জোরালো শট গোলরক্ষক ঠেকালেও বল হাত থেকে ছিটকে পড়ে। ঠিক সেখানেই উপস্থিত ছিলেন মেসি। স্ট্রাইকারদের সহজাত প্রবৃত্তিতে ফিরতি বলে আলতো ছোঁয়ায় ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তিনি। সম্ভবত মেসির ক্যারিয়ারে সবচেয়ে সহজ গোল ছিল এটি।


শেষ কথা বলার দায়িত্বও নিজের কাছেই রেখে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ম্যাচের ৭৬ মিনিটের দিকে বক্সের বাইরে থেকে গনজালেসের কাছ থেকে পাওয়া রিটার্ন পাসে নিচু ও নিখুঁত এক শটে আলজেরিয়ার পোস্টের এক কোণে বল জালে জড়ান। ঝাঁপিয়ে পড়েও লুকা জিদান বলে হাত ছোঁয়াতে পারেননি। গো…ও..ল (৩-০) এবং সে সঙ্গে ক্যারিয়ারে মেসির প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক। পুরো ম্যাচে যেন দশে দশ পারফরম্যান্স মেসির। হ্যাটট্রিকের পর তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। বাড়তি কোনো ইনজুরির ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতেই তার জন্য এই বিশ্রাম।


এ ম্যাচ কেবল মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের নয়, ছিল আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়নসুলভ ফুটবলেরও প্রদর্শনী। মাঝমাঠে দখল, বলের গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে আলজেরিয়াকে প্রায় নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগই দেয়নি স্কালোনির দল। রিয়াদ মাহরেজকে ছাড়া আলজেরিয়ার আক্রমণ ছিল ধারহীন, আর মাঝমাঠের ভুল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে বারবার বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন মেসি ও রদ্রিগো দি পল।


কিন্তু গোটা ম্যাচের সব আলো নিয়ে ফিরলেন ওই একজনই আর তিনি হলেন মেসি!


২০০৬ সালের ১৬ জুন। জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে বদলি নেমে যে কিশোর প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিল, ঠিক ২০ বছর পর সেই তিনিই ৩৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপ মঞ্চে হ্যাটট্রিক করলেন। সময় বদলেছে, প্রতিপক্ষ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে কিন্তু বদলায়নি শুধু মেসির জাদু আর গোলক্ষুধা।


হয়তো এ কারণেই ফুটবল এখনও তাকে দেখে বিস্মিত হয়। আর ইতিহাস? সেটি যেন প্রতি ম্যাচেই তার জন্য নতুন একটি পৃষ্ঠা খালি রেখে দেয়। অপেক্ষায় থাকুন এ বিশ্বকাপের পরের ম্যাচগুলোয় আরো অনেক কাহিনি লিখবেন তিনি!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন