কাউনিয়ায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙন, এক সপ্তাহে বিলীন ২৮ পরিবারের বসতভিটা, মানবেতর জীবনযাপন


কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি

মোঃইব্রাহিম খলিল 

কাউনিয়ায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙন, এক সপ্তাহে বিলীন ২৮ পরিবারের বসতভিটা, মানবেতর জীবনযাপন

বন্যার পানি কমতে শুরু করতেই রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের চর ঢুষমারা এলাকায় অন্তত ২৮টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও প্রায় অর্ধশত পরিবার, একটি জামে মসজিদ, একটি ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।


মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে চর ঢুষমারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক মাস আগেও যেখানে ছিল বসতবাড়ি, সেখানে এখন তিস্তার উত্তাল স্রোত। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। প্রতিদিনই নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বাদশা মিয়া, এরশাদ আলী, মোহাম্মদ আলী, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল হামিদ, জয়নুদ্দিন, ভুলু মিয়া, সেকেন্দার আলী, জাহানারা বেগম (পাগলী), জাফর আলী, রবিউল ইসলাম, গানু মিয়া, আব্দুল আজিজ, মিন্টু মিয়া, জুয়েল মিয়া, শিউলি বেগম, আলিনুর, আব্দুল আউয়াল, জিয়ারুল ইসলাম, সাজাহান আলী, রহিম উদ্দিন, জয়নব বেগম, রুবেল, সাবিহা, নুর আলম, আয়শা, সাবিতন ও আবেদ আলীর বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া ঢুষমারা জামে মসজিদ, ঢুষমারা ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও এখন চরম ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর একেবারে কিনারায় রয়েছে সোলেমান, সুফিয়ান, সাবিল্লা বেগম ও রশিদ মিয়ার বাড়িঘর।


চর ঢুষমারা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, "তিস্তার ভাঙন আমরা বহুবার দেখেছি। কিন্তু এবারের ভাঙন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই অসংখ্য পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়েছে। এখন তারা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।"


নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাদশা মিয়া বলেন, "বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো চর ঢুষমারা একদিন মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।"


আরেক ক্ষতিগ্রস্ত জয়নাল আবেদীন বলেন, "আমরা ত্রাণ চাই না, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা চাই। পাশাপাশি দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।"


আবেদ আলী বলেন, "নির্বাচনের আগে সবাই নদীভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। আমরা নদীশাসনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের দাবি জানাচ্ছি।"


স্থানীয়রা জানান, বসতভিটার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক, মাঠ ও ঘাট। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিনির্ভর মানুষও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।


উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেজবাহুল রহমান বলেন, "ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।"


রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, "চর ঢুষমারা এলাকার নদীভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। খুব শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"


এদিকে, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা অবিলম্বে জরুরি ভাঙনরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।


মোঃ ইব্রাহিম 

কাউনিয়া (রংপুর)প্রতিনিধি

তাং ০১-০৭-২০২৬

মোবাঃ  ০১৭২৩৩১৩৯৪২

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন