মো. নাজমুল আলম: চার দশকের রাজনীতি, ত্যাগ-সংগ্রাম আর আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি একজন নেতার নাম!
জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,ষ্ট্যাফ রিপোর্টার কিশোরগঞ্জ
ছাত্রদল থেকে জেলা বিএনপি, আন্দোলনের ময়দান থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা—সব কিছু পেরিয়ে আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে!!
চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা—ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে জেলা পর্যায়ের দায়িত্ব পালন, সংগঠনের প্রতিটি স্তরে সক্রিয় অংশগ্রহণ, কারাবরণ, আন্দোলনে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব—সব কিছু ছাপিয়ে এখন মো. নাজমুল আলম হয়ে উঠেছেন কিশোরগঞ্জ রাজনীতির এক আলোচিত নাম।
কিন্তু আজ তাঁর পরিচয় শুধুই দীর্ঘ আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে নয়—তাঁকে ঘিরে এখন চলছে তুমুল বিতর্ক, দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যত্যয়, কৌশলগত অংশগ্রহণ এবং দল থেকে বহিষ্কারের বাস্তবতা।
শুরুটা ১৯৮৩ সালে, ছাত্র রাজনীতিতে প্রথম পা রাখেন অষ্টম শ্রেণিতে
মো. নাজমুল আলমের রাজনীতির সূচনা ঘটে ১৯৮৩ সালে, মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে। এরপর সময় গড়িয়েছে, আর তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেড়েছে।
১৯৮৯ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন সময় গ্রেফতার হন প্রথমবারের মতো।
ছাত্রদল থেকে জেলা নেতৃত্বে উত্তরণ
১৯৯১ সালে জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক
১৯৯5 সালে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক
১৯৯৯ সালে সভাপতি
২০০৪ ও ২০১০ সালে দুই দফায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক
২০১১ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য
এই ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে।
আন্দোলন, মামলা ও কারাবরণ
নাজমুল আলমের রাজনৈতিক জীবনে কমপক্ষে পাঁচবার তাঁকে কারানির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। ২০১৪ সালে সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়লাভ করেও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ফল পরিবর্তনের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি।
তিনি শুধু নেতৃত্ব দেননি, নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠে নেমে, ঝুঁকি নিয়ে, নির্যাতন সহ্য করে। এই জন্য তিনি জেলার বিএনপিপন্থী কর্মীদের মধ্যে একজন সাহসী নেতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছিল নির্বাচনে না যাওয়ার। স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক ও পারিবারিক চাপে পড়ে তিনি এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন—যা শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে যায়।
এখনও অনেকেই মনে করেন, এই অংশগ্রহণ পরিকল্পিত প্রতিরোধের অংশ ছিল; কেউ বলেন, এটি ছিল দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ।
বহিষ্কার এবং অনিশ্চয়তা
এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থাকা অবস্থায় তাঁকেসহ প্রায় ১০০ জন নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ বলছেন—দল তাঁর দীর্ঘ ত্যাগ, শ্রম ও ইতিহাস উপেক্ষা করেছে। আবার অনেকে মনে করেন—দলীয় আদেশ অমান্য করে তিনি শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছেন৷
নাজমুল আলম কী বলছেন?
তাঁর সঙ্গে কথা বললে স্পষ্টভাবে জানান:
> “দল আমার প্রাণ। আমি আজীবন জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং থাকবো। আমি কোনো বিদ্রোহ করিনি। স্থানীয় বাস্তবতায় দলীয় ক্ষতি যেন না হয়, সেই বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
ত্যাগের মূল্য হয়তো এখন বোঝা যাচ্ছে না—but time will tell. আমি দলে ফিরতে চাই, কিন্তু সম্মান নিয়ে, মাথা উঁচু করে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মো. নাজমুল আলমের মতো মাঠপর্যায়ের নিবেদিত নেতা যদি এক ভুল কৌশলের জন্য দল থেকে সরে পড়েন, তা বিএনপির জন্যই এক ধরনের ক্ষতি।
তাঁরা মনে করেন, যেহেতু তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক, তাই তাঁকে নিয়ে আবার নতুন করে ভাবা দরকার—কৌশলগতভাবে নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতার জায়গা থেকে।
- প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ইতিহাস
মো. নাজমুল আলম একজন কর্মীবান্ধব, মাঠকর্মী-ঘেঁষা নেতা। হ্যাঁ, তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাঁর চার দশকের রাজনীতির ভাণ্ডারও খুব কম নেতার রয়েছে।
এই মুহূর্তে তিনি এক কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়ে—ফিরে আসবেন, না কি হারিয়ে যাবেন দলের ইতিহাসে এক ‘নষ্ট সম্ভাবনা’ হিসেবে—এ প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

কোন মন্তব্য নেই: