নরসুন্দা নদীর বুকে ‘সেতুর নামে বাঁধ’: এলজিইডির বিরুদ্ধে নদী হত্যা ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ


 জোনিয়েদ হোসেন জুয়েল

স্টাফ রিপোর্টার কিশোরগঞ্জ


কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের নামে স্থায়ী বাঁধ তৈরি করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা। তাদের ভাষ্য, এতে করে ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর পরিণামে পুরো অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

সদর উপজেলার রঘুখালী এলাকায় শহর বাইপাস সড়কের অংশ হিসেবে এ সেতু নির্মাণ শুরু হয় ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর। ৪০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির কাজ ১১ মাসেও শেষ হয়নি। প্রায় দুই কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের অগ্রগতি এ পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ। আগামী এক মাসের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

সেতু না কি পাকা বাঁধ?

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নদীর মাঝখানে সেতু নির্মাণের আগে যেভাবে পাথর, বালু ও মাটি ফেলে পানির প্রবাহ আটকে রাখা হয়েছে, তাতে এটি সেতু নয় বরং একটি বাঁধ হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীটির দুই পাড়ে জমেছে পচা পানি, নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্ষায় নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হবে, বাড়বে বন্যার ঝুঁকি। নদী যদি তার স্বাভাবিক গতি হারায়, তবে শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি ও স্থানীয় জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।

পরিবেশবিদদের তীব্র উদ্বেগ

নদী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এটি একটি চরম অদূরদর্শী প্রকল্প।

‘রিভার বাংলা’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন,

> “এটা আদৌ সেতু কিনা তা নিয়েই সন্দেহ আছে। নির্মাণ কাজ দেখে মনে হচ্ছে—নদীর বুকে ইচ্ছাকৃতভাবে স্থায়ী বাঁধ তোলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সেতুটি অস্বাভাবিকভাবে নিচু। বর্ষায় নৌযান চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়বে। আগে যে নিচু সেতুগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও এখন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই সেগুলো ভেঙে যথাযথ নকশায় নতুন সেতু নির্মাণ হোক।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন,


> “নরসুন্দা নদী খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনে সরকার যেখানে ১৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে, সেখানে এলজিইডি উল্টো নদী ধ্বংস করছে। এটি একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। এর বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আন্দোলনে যাব।”

প্রশাসনের দায় এড়ানো বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত কবীর জানান,


> “প্রকল্পটি অনুমোদিত ডিজাইন ও সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ীই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমি তখন দায়িত্বে ছিলাম না। তবুও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যখন ডিজাইনই নদীর স্বাভাবিক গতিকে উপেক্ষা করে তৈরি, তখন সে ডিজাইনই বা কে অনুমোদন দিল, আর তা বাস্তবায়নের দায় কে নেবে?

উন্নয়ন না ধ্বংস?

সরকার উন্নয়নের নামে নদীর স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দিলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে নয়।

স্থানীয় জনগণও এখন এই সেতু নয়—একটি উপযুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণের দাবি জানাচ্ছে। সেতুর নিচ দিয়ে যেন নদীর পানি ও নৌযান নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সেটিই এখন সময়ের দাবি।

সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত দ্রুত প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করে পরিবেশ, নদীপ্রবাহ ও জনজীবনের উপর প্রভাব বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।



---

কোন মন্তব্য নেই: