ঐতিহ্যের আলোয় আলোকিত দিনাজপুরের কান্তজীউ মন্দির: মাসব্যাপী রাস উৎসবে ভক্ত ও দর্শনার্থীর ঢল
সিয়ামুর রশিদ স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুরঃ
দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী রুক্মিণী কান্তজীউ মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন মাসব্যাপী রাস উৎসব ও মেলা। বুধবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কান্তনগর এলাকা পরিণত হয় ভক্ত, পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের এক মিলনমেলায়।
বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জায় সেজে ওঠা দৃষ্টিনন্দন মন্দিরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ, ভক্তদের সঙ্গীত, প্রদীপের আলো আর পূজার গন্ধে চারদিক যেন হয়ে ওঠে পবিত্র ও শান্তিময়। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে দিনাজপুরের মহারাজ প্রাণনাথ রায় শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলাকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের সূচনা করেন, যা আজ উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে পরিচিত।
ভক্ত ও এলাকাবাসীর অনুভূতি
ভক্তরা জানান, রাস উৎসব তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয় ভক্ত রঞ্জনা দেবী বলেন,
> “প্রতি বছর এই উৎসবের সময়টা আমরা যেন নতুন করে বাঁচতে শুরু করি। ভক্তি, আনন্দ আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এটি।”
দিনাজপুর শহর থেকে আগত দর্শনার্থী মোহন চন্দ্র রায় বলেন,
> “কান্তজীর মন্দির শুধু পূজার স্থান নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের গর্ব। একবার এখানে এলে বোঝা যায়, ধর্মীয় উৎসব কিভাবে মানুষকে একত্র করে।”
এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান,
> “রাস উৎসব মানেই আমাদের এলাকায় প্রাণ ফিরে আসে। হস্তশিল্প, খাবারের দোকান, নাগরদোলা — সবকিছু মিলিয়ে উৎসবটা সবার। মুসলমান, হিন্দু, সবাই এখানে আনন্দ ভাগাভাগি করি।”
মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
রাস পূর্ণিমার রাত থেকেই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে আছে। মেলায় রয়েছে ধর্মীয় কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্নের দোকান, মৃৎশিল্প ও হস্তশিল্প প্রদর্শনী, শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও খেলনার স্টল। প্রতি সন্ধ্যায় স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভজন ও নাট্য পরিবেশনা।
জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থা
দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও কাহারোল উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উৎসবকে ঘিরে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, আনসার ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়োজিত রয়েছে দর্শনার্থীদের সহায়তায়।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রেজাউল করিম বলেন,
> “কান্তজীর মন্দিরে রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন হাজারো মানুষের সমাগম হয়। তাই নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমরা চাই উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক।”
এছাড়াও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা প্রাঙ্গণে চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক
শুধু পূজা নয় — রাস উৎসব এখন দিনাজপুরবাসীর গর্বের এক অংশ, যা ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। এখানে যেমন ভক্তরা পূজায় অংশ নেন, তেমনি স্থানীয় মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন আনন্দের এই মিলনমেলায়।
দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অরুণ বর্মন বলেন,
> “কান্তজীর রাস উৎসব কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। এই উৎসব আমাদের ঐক্য, সহমর্মিতা ও ঐতিহ্যের স্মারক।”

কোন মন্তব্য নেই: