“ক্ষমা করো, সন্তান”—দিনাজপুরে নবজাতক রেখে যাওয়া মায়ের গল্প মন ছুঁয়ে গেল


 সিয়ামুর রশিদ- স্টাফ রিপোর্টার,দিনাজপুরঃ

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা ঘটে। অচেনা এক মা তার নবজাতক শিশুকে নিঃশব্দে সেখানে রেখে যান। শিশুটির পাশে পরে থাকা একটি কাঁপা-হাতে লেখা চিঠি এখন হাসপাতালের করিডোরে মানবিক আলোচনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু।


নাজুক শরীরের শিশুটি যখন শান্ত নিদ্রায়, তার ঠিক পাশেই পড়ে থাকা মায়ের সেই চিঠিতে লেখা—

“আমি একা। সংসারে শান্তি নেই। আমার বাচ্চাটাকে রেখে গেলাম। আপনারা ভালো রাখবেন।”


অপরিচয়, ব্যথা আর অসহায়ের এক হাহাকার যেন লুকানো প্রতিটি শব্দে।


হাসপাতালের ভাষ্য: “শিশুটি নিরাপদ, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত”


হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান—


> “শিশুটি প্রথমে দুর্বল ছিল, তবে দ্রুত চিকিৎসায় এখন স্থিতিশীল। তার পরিচয় আমরা পাইনি। আইনগতভাবে যাচাই ছাড়া কাউকে শিশুটি দেওয়া হবে না।”


হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা যায়—ঘটনার পর থেকেই অন্তত ৭-৮ জন দম্পতি শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রশাসন স্পষ্ট করেছে—


> “আগে একটি জিডি, তারপর সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সঠিক আইনগত প্রক্রিয়া। তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”


 মা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? সমাজের দিকে ওঠে প্রশ্ন


মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন—এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত আসে


পারিবারিক নির্যাতন


অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ


অর্থনৈতিক সংকট


মায়ের প্রসব-পরবর্তী মানসিক অবসাদ

—এসব চাপের কারণে।


হাসপাতালের এক নার্স চোখ ভেজা অবস্থায় বলেন—


> “শিশুটাকে প্রথম দেখি কম্বলে মোড়ানো। পাশেই ছিল চিঠি। তার মায়ের ভিতরে কী যন্ত্রণাই না ছিল, ভাবলে গা শিউরে ওঠে।”


এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া: “একটা জীবনকে কেউ এভাবে ফেলে যায় কীভাবে?”


হাসপাতালের বাইরে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে হতবাক প্রতিক্রিয়া—


এক বৃদ্ধ বাবা বলেন,


> “মা কি ভুল করতে পারে? পারে। হয়তো বাঁচার জন্যই সে পালিয়েছে। কিন্তু শিশুটির কী দোষ ছিল?”


এক তরুণী, দত্তক নিতে আগ্রহী, বলেন—


> “আমরা নিঃসন্তান। এই শিশুকে আমরা নিজের সন্তানের মতো মানুষ করতে চাই। যদি অনুমতি পাই।”


প্রশাসনের পদক্ষেপ


জেলা সমাজসেবা দপ্তর, পুলিশ প্রশাসন ও হাসপাতাল মিলে

✔ শিশুটির জন্মপরিচয় খোঁজ

সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ

শিশুর নিরাপত্তা

দত্তক প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামো

—এসব নিয়ে তৎপর রয়েছে।


সমাজসেবা কর্মকর্তার ভাষায়—


> “আমাদের প্রথম কাজ শিশুটির নিরাপত্তা। তারপর আইন অনুযায়ী সঠিক পরিবার নির্বাচন।”


এক শিশুর হাসি, এক সমাজের দীর্ঘশ্বাস


এক মাস বয়সী শিশুটির ছোট্ট হাত কাঁপছে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রায়।

কেউ জানে না তার মায়ের নাম, জানে না সেই মায়ের কষ্টের গল্প।


কিন্তু জানে—

এই সমাজে জন্মানো মানেই সবসময় নিরাপদ ছায়া পাওয়া নয়।

কখনো কখনো জীবনের প্রথম শ্বাসই শুরু হয় পরিত্যাগ দিয়ে।


শেষ কথা:


এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর নয়—এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধ, নিরাপত্তা, পরিবার নামক শব্দটির শক্তি ও দুর্বলতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন