রাজশাহীতে সাংবাদিক নেতার ওপর হামলা: প্রধান অভিযুক্তরা এখনও গ্রেপ্তার নয়, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
ব্যুরো প্রধানঃরাজশাহী
অপু দাস
রাজশাহীর বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিমের ওপর সশস্ত্র হামলা ও চাঁদা দাবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ঘটনার মূল অভিযুক্তরা এখনও অধরা রয়েছে। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রধান অভিযুক্ত নুরে ইসলাম মিলন ও সুরুজ আলীকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজশাহীর সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিক নেতাদের অভিযোগ, হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু পুলিশ তাদের ‘পলাতক’ হিসেবে উল্লেখ করছে। এমনকি হামলাকারীদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের দাবি, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিমকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে একদল সন্ত্রাসী প্রেসক্লাবে হামলা চালায়। হামলার পর অভিযুক্তদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়ে দম্ভোক্তি করছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তারা প্রশাসনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা দেখিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে বলেও দাবি করেছেন সাংবাদিকরা।
এ ঘটনায় বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলামের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাংবাদিক নেতাদের অভিযোগ, হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে তার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ওসি জানিয়েছেন, মামলার এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে। তবে এজাহারে নাম না থাকা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা কঠিন।
পুলিশের এমন বক্তব্যের পর থেকেই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, মামলার অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
সাংবাদিক নেতারা জানিয়েছেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তারা বলেন, ঈদের আগে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে বড় ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে ঈদের পর থেকে হামলার বিচার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বরেন্দ্র প্রেসক্লাব পরিচালনাকে কেন্দ্র করে কিছুদিন ধরে নুরে ইসলাম মিলন, সুরুজ আলী ও তাদের সহযোগীরা চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে গত ৭ মার্চ রাত প্রায় আটটার দিকে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র, চাপাতি ও ধারালো কুড়াল নিয়ে প্রেসক্লাবে হামলা চালায়।
হামলার সময় অভিযোগ রয়েছে, নুরে ইসলাম মিলন পিস্তল বের করে প্রেসক্লাব সভাপতি রেজাউল করিমের মাথায় ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ সময় সুরুজ আলী ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পেটে আঘাত করার চেষ্টা করলে তিনি হাত দিয়ে তা প্রতিহত করেন। এতে তার উরুতে গুরুতর আঘাত লাগে এবং পরে সেখানে ১৩টি সেলাই দিতে হয়। বর্তমানে তিনি নিজ বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রোববার দুপুরে রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট এলাকায় সাংবাদিকদের উদ্যোগে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন। তারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান অভিযুক্ত নুরে ইসলাম মিলন ও সুরুজ আলীর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের নাম উঠে আসে এবং সে ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় তারা দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন বলে জানা যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করার দাপট দেখিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে।
এ বিষয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি রবিউল ইসলাম জানান, হামলার সময় ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস পুলিশ জব্দ করেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে সাংবাদিক সমাজ মনে করছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং মূল অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এজন্য তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই: