রাজশাহী-১ এ ভোটের পাল্লা দোলাচলে: সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারই চূড়ান্ত নিয়ামক
ব্যুরো প্রধানঃ রাজশাহী বিভাগ
অপু দাস,
রাজশাহী-১ সংসদীয় আসন (তানোর–গোদাগাড়ী) বরাবরের মতোই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, বিপুল ভোটার সংখ্যা এবং সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর কারণে এই আসনের ভোটের অঙ্ক সহজ নয়। নির্বাচনী মাঠে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আর এই লড়াইয়ের ফলাফল অনেকাংশেই নির্ভর করছে সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের অবস্থানের ওপর।
তানোর ও গোদাগাড়ী—এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনের মধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে এই ভোটারদের সমর্থনই জয়-পরাজয়ের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয় দলই এই জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।
এই আসনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মধ্যে। দুই প্রার্থীই নিজ নিজ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তিকে সামনে রেখে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভায় সরব হয়ে উঠেছে তাঁদের প্রচারণা।
এ ছাড়া এবি পার্টির মনোনীত প্রার্থী আব্দুর রহমান (ঈগল প্রতীক) এবং গণ-অধিকার পরিষদের প্রার্থী শাহজাহান (ট্রাক প্রতীক) নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের শক্তির দিক থেকে তাঁরা মূল প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ভোট ভাগাভাগির ক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাব সীমিতই থাকবে।
২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের দখলে থাকা রাজশাহী-১ আসনটি এবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ের পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের বড় নেতাদের এলাকায় তেমন কোনো উপস্থিতি বা তৎপরতা চোখে পড়ছে না। মাঠপর্যায়ে দলটির কার্যক্রমও প্রায় স্থবির। এর ফলে এবারের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা কার্যত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও এই আসনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তানোর উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়ন এবং গোদাগাড়ী উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন। তানোর উপজেলার আয়তন ২৯৫ দশমিক ৪০ বর্গকিলোমিটার এবং গোদাগাড়ী উপজেলার আয়তন ৪৭৫ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার। সব মিলিয়ে মোট আয়তন ৭৭০ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার, যা আয়তনের দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ সংসদীয় আসনগুলোর একটি। এই বিশাল এলাকায় প্রচারণা চালানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটারদের কাছে পৌঁছানো দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৫৯টি। এসব কেন্দ্রেই তরুণ ভোটার, সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোটারদের উপস্থিতি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনী মাঠে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কয়েকজন স্থানীয় নেতার প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান। তাঁদের কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে প্রকাশ্যে ভোট চাওয়ায় এলাকায় কৌতূহল ও আলোচনা বেড়েছে। এক নেতা বলেন, “আমরা অনেকবার প্রতিশ্রুতি শুনেছি। এবার ভিন্ন কিছু দেখতে চাই বলেই নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
স্থানীয় ভোটারদের মতামতেও ভিন্ন ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। তানোর বাজার এলাকার এক ভোটার জানান, “এখানে দুই প্রার্থীই শক্ত অবস্থানে আছেন। শেষ পর্যন্ত যিনি আমাদের এলাকার বাস্তব সমস্যা সমাধানে বেশি আন্তরিক হবেন, আমরা তাঁর পক্ষেই ভোট দেব।” অন্যদিকে গোদাগাড়ীর এক তরুণ ভোটার বলেন, “কর্মসংস্থান, শিক্ষা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এই বিষয়গুলো আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
এদিকে দুই প্রধান দলই নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে। উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চলছে। রাত-দিন বিরামহীন প্রচারণায় পুরো তানোর–গোদাগাড়ী এলাকা এখন নির্বাচনী আমেজে মুখর।
তানোর উপজেলা বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, “নির্বাচন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন।” অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও সমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করছেন, ভোটের মাঠ তাঁদের অনুকূলে রয়েছে এবং ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে রাজশাহী-১ আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। এখানে কোনো পক্ষই নিশ্চিত জয়ের ঘোষণা দিতে পারছে না। বিপুল ভোটার, বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা এবং সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—কার হাতে যাবে রাজশাহী-১ আসনের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব।

কোন মন্তব্য নেই: