রমজানের আগেই রাজশাহীতে লেবুর দাম দ্বিগুণ, খেজুর-শসা ও সবজিতেও উর্ধ্বগতি
পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই রাজশাহী নগরীর কাঁচাবাজারে হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে লেবুর দাম। মাত্র দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে লেবুর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে ২০ থেকে ৩০ টাকা হালিতে লেবু বিক্রি হতো, সেখানে এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে লেবুতে। একই সঙ্গে খেজুর ও শসার দামেও বড় ধরনের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাজশাহী নগরীর সাহেব বাজার, লক্ষ্মীপুর, কোর্ট বাজার, রেলগেট, শালবাগান, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়—কয়েকদিন আগেও স্বল্পমূল্যে পাওয়া লেবু এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ এ দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। অনেক ক্রেতাকে লেবু কিনতে গিয়ে বিক্রেতাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়াতে দেখা গেছে।
খেজুরের বাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধি, কম দামের খেজুরেই বেশি উল্লম্ফন
লেবুর পাশাপাশি রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ খেজুরের বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। গত সাত দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের খেজুরে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম দামের খেজুরগুলোর ক্ষেত্রেই দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি।
বাজারে সবচেয়ে কম দামের খেজুর হিসেবে পরিচিত ‘প্রেম’ খেজুর কয়েকদিন আগেও ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩০০ টাকায় উঠেছে। মাঝারি মানের খেজুর, যা আগে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৩০ টাকা কেজি দরে।
অন্যদিকে মরিয়ম খেজুরের দাম ৯৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার টাকা কেজি। ইরানি মরিয়ম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা কেজি দরে।
শসার দাম ৮০–৯০ টাকা, বেড়েছে ২০–৩০ টাকা
রমজানের আগে ইফতার বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হওয়ায় শসার দামও বেড়েছে। কয়েকদিন আগেও ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হওয়া শসা বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ শসার দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।
সবজির বাজারেও অস্থিরতা, কিছু পণ্যে স্বস্তি
বাজারে লেবু, খেজুর ও শসার পাশাপাশি বিভিন্ন সবজির দামেও বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকটি সবজির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে নগরীর বাজারগুলোতে সবজির দাম নিম্নরূপ:
বেগুন: ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি
কাঁচামরিচ: ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি
টমেটো: ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি
লাউ: ৫০ থেকে ৬০ টাকা
নতুন করলা: ১৬০ টাকা কেজি
তবে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে। পালং শাক ২০ টাকা আঁটি, ফুলকপি ৩০ টাকা কেজি এবং পেঁয়াজ ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে আলু, যা ২০ টাকার নিচে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ: “রমজান এলেই বাজার সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়”
বাজার করতে আসা নগরীর এক বাসিন্দা মাহিনুর বলেন,
“রমজান এলেই একটা বড় সিন্ডিকেট বাজার দখল করে দাম বাড়িয়ে দেয়। দুইদিন আগে যে লেবু ৩০ টাকায় কিনেছি, আজ সেটাই ৭০ টাকা।”
আরেক ক্রেতা রহিম আলী বলেন,
“রমজানে যেসব সবজি বেশি প্রয়োজন হয়, সেগুলোর প্রায় সবগুলোরই দাম বেড়েছে। আলু ছাড়া কম দামে কিছুই নেই।”
বিক্রেতাদের বক্তব্য: পাইকারি বাজারেই সংকট, সামনে আরও দাম বাড়তে পারে
লেবু বিক্রেতা ফয়জুল্লাহ জানান, পাইকারি বাজারেই লেবুর সংকট দেখা দিয়েছে। বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সামনে লেবুর দাম আরও বাড়তে পারে।
সাহেব বাজারের খেজুর ব্যবসায়ী মো. লালন আলী বলেন,
“কয়েক দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কম দামের খেজুরেই বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।”
ভোক্তা অধিকার: নিয়মিত মনিটরিং ও রশিদ যাচাই চলছে
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক মো. ইব্রাহীম হোসেন বলেন,
“রমজান উপলক্ষ্যে প্রতিদিন বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে খেজুরের ক্রয়মূল্যের রশিদ যাচাই করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
রমজানকে সামনে রেখে ইফতার সামগ্রীর বাজারে এমন আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন ক্রেতারা। বাজারে কার্যকর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সামনে লেবু, খেজুরসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই: