রাজশাহী-২ আসনে ভোটারদের ঘরে ঘরে ডা. জাহাঙ্গীর, স্বাস্থ্যসেবা-শিল্পায়ন-সংস্কারে অঙ্গীকার


 

ব্যুরো প্রধান,রাজশাহী বিভাগ 

অপু দাস, 


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহী-২ (সদর/মহানগরী) আসনে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী এবং রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। চিকিৎসা পেশায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং মানবসেবায় সম্পৃক্ততার কারণে নগরবাসীর কাছে তিনি ‘গরীবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।

নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিয়মিত নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করছেন। দ্বারে দ্বারে গিয়ে মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সমস্যার কথা শুনছেন এবং রাজশাহীর উন্নয়ন ভাবনা তুলে ধরছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি রাজশাহীর স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, কৃষি উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও সমাজ সংস্কারের বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে জানান।

রাজশাহী মেডিকেলের শয্যা সংকট দূর করাই প্রথম অগ্রাধিকার

ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংকট। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বাজেট সংকটের কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তার ভাষায়, হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও বেড রয়েছে মাত্র ১২০০। ফলে বহু রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। তিনি বলেন, “রোগীদের এই ভোগান্তি শুধু দুঃখজনক নয়, এটি একেবারেই অমানবিক।”

নির্বাচিত হলে ৩ হাজার বেডের হাসপাতাল গড়ার প্রতিশ্রুতি

নির্বাচিত হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেড সংখ্যা ১২০০ থেকে ৩ হাজারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন ডা. জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, শুধু বেড বাড়ালেই হবে না; চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং রোগীদের জন্য মানসম্মত ওষুধ-পথ্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালের বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে রোগীরা যেন প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসা সুবিধা সহজে পায়—এটাই হবে আমাদের লক্ষ্য।”

সদর হাসপাতাল ও ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা

স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের অংশ হিসেবে তিনি রাজশাহী মহানগরীতে একটি পূর্ণাঙ্গ সদর হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান। তার মতে, মহানগরীতে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকলেও তা জনসংখ্যা এবং রোগীর চাপ সামলাতে পারছে না। তাই আলাদা সদর হাসপাতাল স্থাপন সময়ের দাবি।

এছাড়া রাজশাহীতে বিদ্যমান ডেন্টাল ইউনিটকে পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজে উন্নীত করারও অঙ্গীকার করেন তিনি। এতে রাজশাহীর শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকায় থেকেই ডেন্টাল শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং সেবার মানও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

রাজশাহীর বেকারত্ব কমাতে ইপিজেড ও এগ্রোবেসড শিল্পের ওপর জোর

রাজশাহীর বেকারত্ব প্রসঙ্গে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, রাজশাহীকে ‘সিল্ক সিটি’ কিংবা ‘ম্যাঙ্গো সিটি’ বলা হলেও বাস্তবে এখানে শিল্পকারখানা কম এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে বহু শিক্ষিত তরুণকে চাকরির জন্য ঢাকা কিংবা দেশের অন্য জেলায় যেতে হয়।

তিনি বলেন, “রাজশাহীতে দ্রুত একটি ইপিজেড স্থাপন করা হলে এখানে শিল্পায়ন হবে, বিনিয়োগ আসবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”

এছাড়া তিনি কৃষিভিত্তিক শিল্প (এগ্রোবেসড ইন্ডাস্ট্রি) গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, রাজশাহীর কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

হাইটেক পার্ক সচল ও বিসিক-রেশম শিল্প পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকার

ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, রাজশাহীতে থাকা হাইটেক পার্ককে কার্যকর করে আইটি খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে রাজশাহীর তরুণ সমাজকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজশাহীর বিসিক শিল্পনগরী এবং ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প আজ প্রায় মৃতপ্রায়। যথাযথ পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং উদ্যোগ থাকলে এই শিল্পগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

তিনি বলেন, “রাজশাহীর রেশম শিল্প আমাদের ঐতিহ্য। এটিকে বাঁচানো শুধু অর্থনৈতিক নয়, ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়ও।”

পদ্মার পানি সেচের আওতায় এনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা

পদ্মা নদীকে রাজশাহীর বড় সম্পদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে পদ্মার পানি সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।

নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত করার প্রত্যয়

সমাজ সংস্কার নিয়ে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, তিনি নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চান। নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া তিনি রাজশাহীকে মাদক, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজিমুক্ত করার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, “মাদক ও অপরাধ সমাজের জন্য বড় হুমকি। আমরা চাই একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাজশাহী।”

আচরণবিধি মানতে কর্মীদের কঠোর নির্দেশ

নির্বাচনী আচরণবিধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের দলের সকল নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা এবং আইন মেনে চলার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে তারা সচেষ্ট থাকবে বলেও জানান তিনি।

জুলাই সনদ ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনের ঘোষণা

জুলাই সনদ এবং গণভোট প্রসঙ্গে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, “আমরা সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্যের পক্ষে। দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে, সেজন্য আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত তৈরি করছি।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগের কয়েকটি নির্বাচনের মতো এবার যেন আর কোনো ‘ডামি নির্বাচন’ না হয়। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে জুলাই সনদের বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

রাজশাহী-২ আসনের ভোটার সংখ্যা

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজশাহী-২ (মহানগরী) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন।

এর মধ্যে—

পুরুষ ভোটার: ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৫১ জন

নারী ভোটার: ১ লাখ ৯১ হাজার ৩০৫ জন

তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার: ৮ জন

রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ আসনে নতুন করে আলোচনায় জামায়াতের প্রার্থী

রাজশাহী-২ আসন রাজশাহী জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদধারী নেতারা এই আসনে নির্বাচন করেছেন এবং অনেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে গেছেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের পক্ষ থেকে একজন চিকিৎসক ও সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, নগরবাসীর বড় অংশ বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ সমাজ—এই বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই: