রাজশাহী বিভাগে হামের ভয়াবহ বিস্তার: সংক্রমণ ৩১% ছাড়িয়ে, শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে দ্রুত
ব্যুরো প্রধানঃরাজশাহী
অপু দাস
রাজশাহী বিভাগে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনস্বাস্থ্যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগে হামের সংক্রমণের হার বেড়ে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা ২৪৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৭৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি স্পষ্ট করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী এবং পাবনা জেলায় সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রোববার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮০ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৭১ জন এবং পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ২১ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। এসব হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। গত ১৮ মার্চ ভর্তি হওয়া ১৫৩ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা প্রায় ২৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পাবনা জেলায় চলতি মাসে ১১৮ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন মারা গেছে এবং বেশ কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২১ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জানুয়ারিতে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আক্রান্তদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হলেও শনাক্তের হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে সেখানে বহু শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক হাসপাতালে সংক্রামক রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় একই ওয়ার্ডে বিভিন্ন রোগের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর শুরুতে সীমিতভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য আইসিইউ সুবিধা প্রয়োজন হলেও সব ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেক সময় আইসিইউতে নেওয়ার আগেই অথবা অপেক্ষারত অবস্থায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের হাম-রুবেলা টিকা পায়নি। আবার কিছু শিশু ৯ মাস বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
সাধারণত চার বছর পরপর হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০২৫ সালে নতুন কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি চালু, আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা, আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্তদের পৃথকভাবে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই: