হাতিয়ায় বন রক্ষক ও ভূমি অফিসের অনিয়ম-গাফিলতিতে জাতীয় উদ্যান বিরানভূমি
উপজেলা প্রতিনিধিঃহাতিয়া,নোয়াখালীমাহিদুল ইসলাম হিমেল
নোয়াখালীর হাতিয়ায় সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে গাছ কাটার মহোৎসব। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাদের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা এবং ভূমি অফিসের অনিয়মতান্ত্রিক বন্দোবস্তের কারণে মাইলের পর মাইল বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে ব্যাপকহারে গাছ কাটা ও রিং দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বনভূমি এখন বিরানভূমিতে পরিণত হওয়ার সন্নিকটে।
বনবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সূত্রে জানা যায়, জাহাজমারা রেঞ্জের ৪টি বিটের আওতায় ১৩টি চরে সরকারি গেজেটভুক্ত প্রায় ২১ হাজার ৪৪ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। এছাড়া ১১টি চরে সরকারি গেজেটভুক্ত ৪০ হাজার ৩৯০ একর এলাকা নিয়ে গঠিত নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ এলাকাকে “নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান” ঘোষণা করে।
হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল হাতিয়া উপজেলাধীন নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে। কিন্তু বাস্তবে এ কমিটির কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় উদ্যানের সরকারি গেজেটভুক্ত চর ইউনুসকে চর হেয়ার ও নতুন সুখচর নামকরণসহ বিভিন্ন চরকে নতুন নামে চিহ্নিত করে ভূমি অফিস হাত নকশা তৈরি করে বন্দোবস্ত দেয়। এতে ভূমিখেকোরা বনভূমি দখলের সুযোগ পায়। টাস্কফোর্স গঠনের পরও ভূমি অফিস কর্তৃক বন্দোবস্ত দেওয়া বনভূমির মধ্যে চর কালামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় চার মাস আগে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। চর ইউনুস এলাকায় ১৭৪, ১৭৫, ১৫০, ১৫১, ১৫৩, ১৫৪ ও ১৫৯ নম্বর খতিয়ানসহ অসংখ্য খতিয়ান খুলে বন্দোবস্ত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
টাস্কফোর্স কমিটির সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল। সভায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগ যৌথভাবে সরেজমিনে তদন্ত করে জবরদখলকারীদের তালিকা প্রস্তুত এবং দখলকৃত ভূমির পরিমাণ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। একইসঙ্গে সংরক্ষিত বনের সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় ভূমি অফিসকে নতুন বন্দোবস্ত না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বন্দোবস্তকৃত বনভূমি বুঝিয়ে না দিতে বলা হয়।
এছাড়া সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানের ১৩টি চরের ডিজিটাল জরিপ কাজ শুরু করার জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বনভূমি দখল ও গাছ কর্তন বন্ধে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও কোস্টগার্ডকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের কিছুদিন পর থেকেই আবারও শুরু হয় বন সাফ করার ঘটনা। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর চর ইউনুসের আমতলী প্রজেক্ট (টুয়াচর ও রাস্তার চর) এলাকায় ব্যাপকহারে গাছ নিধন করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বনের এই গাছ নিধনের ক্ষেত্রে স্থানীয় দুই রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় থাকা প্রায় ৫৫ থেকে ৬০জন বন অপরাধীর সাথে শতাধিক ভূমি লোভী নারী-পুরুষ যুক্ত হয়। একই সময়ে নিঝুম দ্বীপ বিট এলাকাতেও চলতে থাকে বনের গাছ কাটা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, অপ-রাজনীতির প্রভাবের পাশাপাশি জাহাজমারা রেঞ্জ কর্মকর্তা, সদর বিট কর্মকর্তা এবং চর ওছমান (নিঝুম দ্বীপ) বিট কর্মকর্তার চরম গাফিলতির কারণেই বন ধ্বংস ঠেকানো যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অতীতে ধীরে ধীরে বন কাটার ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ঘটনাকালে জাহাজমারা রেঞ্জ কর্মকর্তা ছিলেন ৪১তম বিসিএস (বন) ক্যাডারের কর্মকর্তা এসিএফ একেএম আরিফ-উজ-জামান, যিনি রেঞ্জ প্রশিক্ষণে ছিলেন। সে সময় ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা ছিলেন নিঝুম দ্বীপ বিট কর্মকর্তা মো. জাহিদ প্রামানিক। বর্তমানে তিনিই নিঝুমদ্বীপ বিট কর্মকর্তা ও জাহাজমারা রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আউটসোর্সিং কর্মী মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে রেঞ্জ কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। প্রায় সাত বছর আগে তিনি জাহাজমারা রেঞ্জে যোগ দেন। সে সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইফুর রহমানের কার্য ক্ষেত্রের সহায়ক ছিলেন। পরে স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বন বিভাগের ওপর প্রভাব খাটিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বন অপরাধ চলাকালে রেঞ্জ কর্মকর্তা আরিফ-উজ-জামান কেবল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহি…

কোন মন্তব্য নেই: